RESEARCH CONSULTATION-INTERVIEW INTERPRETER ASSISTANCE-BOOK ACQUISITION IN INDIA & ABROAD ON DEMAND
Monday, 31 August 2026
Lui Pa - Charyagiti - Arabinda Chattopadhyay
প্রথম বাংলা সাহিত্য যদি চর্যাপদ হয় তাহলে প্রথম কবি লুইপা। তাঁর লেখা প্রথম পদটির পাঠ উদ্ধারে শাস্ত্রী মশায়ের যেটুকু ভুল হয়েছিল, নালন্দা পত্রিকায় আগেই আমরা তা নিয়ে আলোকপাত করেছি । লুইপা কোথাকার লোক ছিলেন? শাস্ত্রী বলেছিলেন লুইপা রাঢ়ের বাসিন্দা ছিলেন । আমরা তাঁর সমর্থন পাচ্ছি ক্ষেত্র গবেষণায় । আশিস পান্ডে সম্পাদিত বাংলার আভাষ পত্রিকায় প্রকাশিত হল-
" লুইপা, লুই, লুইচন্দ্রের সন্ধান
অরবিন্দ চট্টোপাধ্যায়
চর্যাগীতি প্রথম না হলেও প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের নিদর্শন। এর প্রথম পদটি কবি লুইপার রচিত। আবিষ্কারক হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মত হল, লুইপা রাঢ় দেশের কবি ছিলেন। শাস্ত্রীর ভাষায়- "আমি স্থির করিয়াছি যে, তিনি রাঢ় দেশের লোক ছিলেন। তিনি যে বাঙ্গালী, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। সংস্কৃতে তাঁহার চারিখানি পুস্তক আছে। একখানির নাম বজ্রসত্ত্বসাধন।” (মুখবন্ধ। হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা)। শাস্ত্রীমশাই তাঁর অনুমানের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন যে, রাঢ়দেশে ধর্মঠাকুরের পূজায় এখনও লুই-এর নামে পাঁঠা উৎসর্গ করা হয়। ময়ূরভঞ্জ অঞ্চলেও লুই-এর পূজা চলিত আছে। তাঁর মতকে আমরা সমর্থন করি। বাঁকুড়া জেলার অনেক গ্রামে এখনও লুই-এর পূজা হয়, লুই-এর থান আছে। ওন্দার মাঠে লুইচন্দ্রের পূজা হয়, বিষ্ণুপুর সংলগ্ন দ্বারিকাতেও লুই-এর থান আছে। এখানে লুইঠাকুরের ক্ষেত্রানুসন্ধান করা হল।
১.
দ্বারকেশ্বর নদ তীরবর্তী বেল্যাড়া গ্রামের দক্ষিণে একটি মাঠ আছে। প্রাচীনেরা বলেন ওন্দার মাঠ। এখানে ডোমেরা, বাদ্যকর পদবির কয়েকটি পরিবার লুইচন্দ্রের বা লুইঠাকুরের পূজক। মাঘ মাসে পুজা হয়। এই পূজাপদ্ধতি লৌকিক তন্ত্রাচারের ভয়ঙ্কর কৃচ্ছসাধন। ধর্মঠাকুরের গাজনে বাঁকুড়ার ময়নাপুর, লেগো, রাজশোল, সলদা সর্বত্রই 'লুই-এর পাঁঠা' বলি হয় 'ঘরভরা' নামক অনুষ্ঠানে। আশুতোষ ভট্টাচার্য বলেছেন-"লুয়ে বলি দিয়া ইহার ছিন্ন মুণ্ডটি একটি হাঁড়ির মধ্যে পুরিয়া সারারাত সেই হাঁড়িটি কোলে করিয়া বসিয়া থাকিলে বন্ধ্যা নারী পুত্রলাভ করে বলিয়া বিশ্বাস" (বাংলা মঙ্গলকাব্যের ইতিহাস। পৃ. ৫৩২)। এই লুই-এর নামেই কবির নাম লুইপা বলে অনুমান করি। যেমন, চণ্ডীর নামে চণ্ডীবর, চণ্ডীদাস; তেমনি কোমদেবতা লুই-এর নামে চর্যার কবির নাম লুই হয়েছে। এই নৃতাত্ত্বিক সূত্র থেকে বোঝা যায়, চর্যার পদকর্তা লুই-এর নিবাস রাঢ়েই ছিল।
লুইপার দুটি পদ (১,২৯) হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আবিষ্কৃত ও সম্পাদিত গ্রন্থে আছে। তাঁর প্রথম (১ সংখ্যক) পদটির ভাষা বিচার করলে রাঢ়ের ভাষার লক্ষণ পাওয়া যাচ্ছে। এই পদের একটি চরণ হল-
“এড়িএউ ছান্দক বান্ধ করণক পাটের আস।"
"ছান্দক বান্ধ' শব্দের অর্থ এতকাল সঠিক উদ্ধার হয়নি। শাস্ত্রীমশাই এর অর্থ করেছেন- 'ছন্দের বন্ধন'।
আমরা মনে করি এর অর্থ হল 'ছাঁদন বাধন'। ছাঁদন দড়ি বলতে বোঝায়, গাইয়ের দুধ দোয়ার সময় নরম পাটের দড়ি দিয়ে তার পিছনের পা দুটিকে বাঁধা। পশ্চিম রাঢ়ের ভাষায় এটি এখনও প্রচলিত। মল্লভূমের কবি দ্বিজকবিচন্দ্রের কপিলামঙ্গল কাব্যেও এটি আছে।' কপিলা গাভী শিবকে বলেছেন তাঁর মর্ত্যভূমে যেতে কী কী সমস্যা রয়েছে। তার একটি হল মানুষের নিষ্ঠুরতা; যথা-
'ছান্দন দোহন করি লঞা যাব দূরে।''
অর্থাৎ পায়ে জোর করে বেঁধে বাঁট থেকে দুধ দুইবে, তারপর দূরে নিয়ে যাবে চরাতে।
ঘাঁটাল-আরামবাগ-বিষ্ণুপুর, এই তিনটি মহকুমার তেত্রিশটি ধর্মের গাজন আমরা স্বচক্ষে দেখেছি। প্রতিটি প্রাচীন। প্রতিটিতে আদিম ধর্মাচার এখনও পালিত হয়। ধর্মের গাজনে যে 'লুইভরা' অনুষ্ঠানটি হয় সেটি স্বতন্ত্র এক দেবতা লুই-এর পূজা। বিদ্যাসাগর মশাইয়ের জন্মভূমি বীরসিঙা গ্রামে কালীবুড়ির মন্দির মধ্যে আছে বীরসিঙার শিলামূর্তি ও ধর্মঠাকুর বাঁকুড়া রায়। বাঁকুড়া রায়ের সেবায়েৎ গ্রামের 'পণ্ডিত' ডোম পরিবার। সেখানে ধর্মের গাজন হয় কুড়ি-তিরিশ বছর পর পর। সিদ্ধেশ্বর পণ্ডিত জানালেন, একে বলে 'লুয়ে কাটা গাজন'। লুই কে? তাঁর বক্তব্য হল-তিনি বাঁকুড়া রায়ের মতোই এক ঠাকুর, যিনি ধর্মের গাজনে মিশে আছেন; যেমন-
‘শিবের গাজনে নীল, নীলের ব্রত; তেমনি হলেন লুই।'
২.
বিড়াই ও দ্বারকেশ্বর। এই দু-নদীর মাঝে দ্বারিকা গ্রাম। পশ্চিম থেকে পূর্ব-বাহিনি দ্বারকেশ্বরের উত্তর তীরে জয়কৃষ্ণপুর বা গহীরহাটি, কাঁকিল্যা, ভাটরা গ্রাম। সমান্তরালে দক্ষিণ তীরে বেলঠ্যা, অবন্তিকা ও দ্বারিকা। দ্বারিকার পশ্চিমে মথুরা, দক্ষিণে বিড়াই নদী, উত্তরে বেলঠ্যা ও অবন্তিকা এবং পূর্বে দেউলি ও বিড়াই নদীর মুণ্ডমালাঘাট। আরও একটু দূরেই চাকদহ গ্রামের কাছে বিড়াই ও দ্বারকেশ্বর নদীর সঙ্গমস্থল। এই এলাকাটি প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। দ্বারিকা বেশ বড় গ্রাম। জনসংখ্যা তিন হাজারের বেশি। হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের এখানে বাস। দ্বারিকার উল্লেখযোগ্য লোকদেবতা হলেন লুই বা লুইচাঁদ।
গ্রামের একটি পুকুরের নাম হল লুই। তিলিপাড়ায় আছে লুইচাঁদের থান। নন্দী পদবির তিলিদের ইনি দেবতা। নন্দীদের বাখুলের সবাই এঁর সেবায়েত। অবশ্য পুজা ও মানত সবাই করেন। গ্রামে তিলি সম্প্রদায়ের বাস, তাঁদের পদবি পাল, নন্দী। এছাড়া আছে কায়স্থ পদবি হল সরকার, রায়, বিশ্বাস, মজুমদার। ব্রাহ্মণ: চক্রবর্তী, রায়। বাগ্দি : মাজি, বাগ্দি। শুঁড়ি : মণ্ডল। তামলি: দত্ত। ময়রা: কুণ্ডু ও বাউরি জাতির পদবি এ গ্রামে লেখে বাউরি।
গ্রামের মুসলিমদের পদবি হল মিদ্যা, শেখ, মল্লিক, খাঁ ইত্যাদি। গ্রামে মোট একুশটি পুকুর আছে। এগুলির মধ্যে পনেরোটি প্রাচীন। প্রাচীন পুকুরগুলির নাম-লুইপুকুর, জলহরি, বড় দু-সতীনা, ছোটো দু-সতীনা, কীর্তন্যা, গয়লাড়্যা, বেজবান্দী, কৈবাথা, বামুনপুকুর, শেকা, ঠাকরান গড়্যা, নিশিপুকুর, কৃষ্ণসায়ের, ছুতারা বা ছাতারা ও লইতনা বা লতুনবাঁধ। গ্রামের উত্তরে একটি জলধারা বা খাল আছে, এর নাম কানানদী। হাজাবিল থেকে কুশতড়া ও শ্যামাবিল পর্যন্ত বর্ষায় বিড়াই নদীর জলপ্লাবন ঘটত। ধানের জমিগুলি বেশ ঊর্বর। তবে একদিন ‘ঘুঘু চরবে' এই সবুজভূমিতে মাফিয়া রাজনীতির কল্যাণে। কয়েকটি স্পঞ্জ আয়রন কারখানার দূষণ শেষ করে দিচ্ছে এখানকার পরিবেশকে। সেই সঙ্গে বিড়াই ও দ্বারকেশ্বরে চলেছে বালি লুটের রমরমা ব্যবসা, প্রশাসনের প্রত্যক্ষ যোগসাজসে। এর খেসারত দিতে হবে মানুষকে।
৩.
গ্রামের তিলিপাড়ায় লুইচাঁদের পূজা হয়। গুঁইবালা নন্দী জানালেন, অন্তত ন-দশ পুরুষ ধরে (প্রায় ৩৫০ বছর) নন্দী বাখুলের লোকেরা লুই-এর পূজক। একটি মাটির চাতালে মাকড়া পাথর দিয়ে বাঁধানো ঢিবির মধ্যে ছিল দুটি ভেষজ গাছ, লৌহমল (Iron Slag) ও একটি সবুজাভ চকচকে পাথর যা রোগ নিরাময়ে অতীতে ব্যবহার হত। সেই সঙ্গে মাটির হাতি-ঘোড়া; অবশ্যই বোঙাহাতি।
এই হলেন লুইঠাকুর। কয়েকশো বছর আগে লুইচাঁদের থানটি মল্লরাজারা বেঁধে দিয়েছিলেন। পরে ধ্বংস হয়ে যায়। থানটি নীচু ও পাশের জলহরি পুকুরের সংলগ্ন হওয়ায় বর্ষায় ডুবে যেত। এভাবেই একদিন আগের পাথরগুলি হারিয়ে যায়। নন্দীরা ভেবেছিলেন মন্দির নির্মাণ করবেন ! তা ভেস্তে যায় দেবতার অমতে। একদিন গ্রামের দেয়াশী 'ঝাণে দিঠা' দেবতার মাথার ওপর ছাদ করা চলবে না ; অর্থাৎ পূজারী পূজাতে বসলেন দেবতার অনুমতি নেওয়ার জন্য যে, ভক্তরা চান মন্দির বানাবেন। পূজাতে বসার পর ভরমে জানা যায়, তিনি খোলা থানেই থাকতে চান, মন্দিরের দরকার নেই। 'ভরমে' শব্দটি যখন শুনি গ্রামের এক বৃদ্ধার মুখে তখনই খটকা লাগে! বাংলা অভিধানে ভরমে শব্দের অর্থ ভ্রমে, সম্ভ্রমে পাচ্ছি। বিষ্ণুপুরী রামায়ণে দ্বিজ কবিচন্দ্র শব্দটি ব্যবহার করেছেন-
'ভরমে রামের নাম শূন্যতলে লেখি'।
মল্লভূম তথা বিষ্ণুপুরের উপভাষায় 'ভরমে' মানে ভরক্রমে বা মানুষের ওপর দেবতার ভর হলে। এটি প্রাচীন বাংলা শব্দ, বাঁকুড়ার কথ্য শব্দ।
বুঝিলাম, এখনও বাংলা ভাষা আছে পণ্ডিতের অধ্যাপনায় নয়, মহানগরীর শীতাতপবাসী বুদ্ধিবিদদের কলমে নয়, দ্বারিকার গ্রামবৃদ্ধার মুখে। ভরমে দ্বারিকার লুইচাঁদের পূজারি জানতে পারলেন যে, ঐ প্রাচীন বৃক্ষ দুটি কেটে শুধুমাত্র হাতি-ঘোড়া জোড়া-ঠাকুরথানটির ছাদযুক্ত মন্দির বা বাড়ি বানানো চলবে না। দেবতা বুঝিয়ে দিলেন ঐ দেয়াশীর জ্ঞাননেত্র উন্মোচন করে যে, ঐ গাছগুলিই তো আসল ঠাকুর। জীবনদায়ী ভেষজ গুণসম্পন্ন প্রকৃতি দেবতা। ওদের উচ্ছেদ করে মন্দির বানালে, সে মন্দিরে দেবতা নেই, সুন্দর নেই,সত্যও নেই।
দ্বারিকার স্বল্পশিক্ষিত সেই পূজক যে জ্ঞানলাভ করেছেন, সদ্য প্রাক্তন হওয়া সরকারের শাসক ও বাঁকুড়ার সারেঙ্গার বিডিওর সেই জ্ঞানটুকু থাকলে, সারেঙ্গা ব্লকের আমঝোরের রাস্তায় সারি সারি সুদৃশ্য তালগাছগুলি কেটে পিচ রোডের বহর বাড়াতেন না।
লুইচাঁদের থান ১৪ আষাঢ়, ১৪২১ পুনঃসংস্কার করেন গ্রামের তেলিপাড়ার মানুষ। স্থান পরিবর্তন হয় একটু। যা ছিল শুধুমাত্র নন্দী বাখুলের, এখন গোটা তেলিপাড়ার জায়গাতে ঠাকুরের থানটি পুনর্নির্মিত হয়। পৌষ মাসের ১০ তারিখে পূজা ও খিঁচুড়ি (খেঁচুড়ি) ভোগ দেওয়া হয়। নিত্যপূজা হয়। সকালে আলোচাল ও বিকেলে মুড়ি দিয়ে, সঙ্গে একটু বাতাসা, মিষ্টি। উত্থন একাদশী ও শয়ন একাদশীতে বড় পূজা হয়। পূজা করেন লক্ষ্মণ চক্রবর্তী। এছাড়া মানত শোধে পূজা হয় এবং কালীতলায় পূজা দেওয়া হলে এখানে সঙ্গে সঙ্গে পূজা দিতে হয়। বোঝা যায়, এ কালীতলার প্রত্নস্থলের সঙ্গে সুপ্রাচীন একটা সম্পর্ক আছে লুইচাঁদের থানের। কী সেই সম্পর্ক? পরে আসছি সে আলোচনায়।
8.
দ্বারিকার মুসলমানেরা বেশ প্রাচীন বাসিন্দা। সম্ভবত এখানকার মিদ্যারা ইন্দাস থানার রোল থেকে আগত, অথবা এখানকার মিদ্যারা ইন্দাসের রোলে গেছেন। গ্রামে দুটি মসজিদ, একটি পুরোনো। একটি ইদ্গা আছে পচিপাড়াতে। দুটি কবর স্থান রয়েছে। বিড়াই নদীর ধারে হিন্দুদের একটি শ্মশান ঘাট আছে। দ্বারিকায় প্রাচীন একটি শিবলিঙ্গ আছে কিন্তু গ্রামে কোনও শিবগাজন হয় না। কারণ সামনেই ডিহর। সেখানে ষাঁড়েশ্বর শিবের গাজনে সবাই যায়। হিন্দুদের প্রতি ঘর থেকে অন্তত একজন যাঁড়েশ্বরের গাজনে ভক্ত্যা হয়। গ্রামে বেশ কয়েটি মনসার থান, ভৈরবথান আছে। একটি প্রাচীন মন্দির আছে লক্ষ্মী-জনার্দনের। দুর্গামন্দিরের পাশেই। এটি দোলমন্দির নামে পরিচিত।
দোলের সময় লক্ষ্মী-জনার্দনকে স্থাপন করে তিনদিন কীর্তন চলে। এখনও দু-দিন যাত্রানুষ্ঠান হয়। আগে গ্রামের লোকেরাই যাত্রা করতেন। তখন দ্বারিকায় বেশ প্রসিদ্ধ ছিল গ্রামীণ যাত্রা। বছর পাঁচেক গ্রামের যাত্রা বন্ধ হয়ে গেছে দোলে। এখন বাইরের পার্টি আসে। কিছুকাল আগে তক্ক মদন মাজির নির্দেশনায় যাত্রা হত। শিল্পীদের মধ্যে উল্লেখ্য হলেন-শেখ আনিশ, অজয় রায়, মৃত্যুঞ্জয় রায়, বিশ্বজিৎ রায়, মৃত্যুঞ্জয় পাল, সোমনাথ মজুমদার প্রমুখ। সোমনাথ মজুমদারের নির্দেশনাতেও গ্রামে একটি যাত্রা দল গড়ে উঠেছিল। এখন সব বন্ধ। শুধু কীর্তন গানটি টিকে আছে। তিলিপাড়ার মেলাতে সন্ধ্যাবেলায় কীর্তন গান-তরুণ পাল (৩৫), কালীপদ সো (৬৫), সুকুমার নন্দী (৫০), জিতেন নন্দী (৩৫), বিকাশ নন্দী (৪০), গুরুপদ নন্দী (৩১), বিজয় নন্দী (৬০)। কালীমন্দিরের আটচালায় মাটির গৌর-নিতাই গড়ে প্রতি বছর চব্বিশ প্রহর ও অষ্টম প্রহর হয়।
তিলিপাড়া, বাগদিপাড়া ও বাউরিপাড়ার হয় কালীমন্দিরে। দুর্গামন্দিরের সামনে অষ্টপ্রহর হয় রায়-ব্রাহ্মণদের। তিলিপাড়ার অপূর্ব নন্দীর বাড়িতে গৌর-নিতাইয়ের ধাতবমূর্তি রয়েছে। সেগুলি উভয়স্থানেই নিয়ে যাওয়া হয়। অ্যাত বড়ো সমাজ, অ্যাত পাল-পার্বণ দ্বারিকায় সম্পন্ন হয় প্রাচীন সিস্টেমেই। সুসম্পন্ন যাকে বলি। এখনও গ্রামের মাথা আছেন, তাঁকে বলে 'মুখ্যা'। মুখ্যার পরামর্শ ছাড়া কিছু চলে না। আগে মুখ্যা ছিলেন গোলোকবিহারী নন্দী মশায়। এখন তাঁর ছেলে বাসুদেব নন্দী। গ্রামের ধর্মীয় ও পারিবারিক অনুষ্ঠান করতে হলে মুখ্যার অনুমতি নিতেই হয়। এছাড়া আছেন 'আটপৌরী'। গ্রামের আটপৌরীদের কাজ হল রিপোর্টিং। মুখ্যার কোনও ঘোষণা থাকলে আটপৌরী বাড়িতে বাড়িতে জানিয়ে দেন। এছাড়া গ্রামের কারও বাড়িতে অনুষ্ঠান, গ্রামে কোনো মিটিং থাকলে, ধর্মীয় অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ ঠিক হলে গ্রামের আটপৌরী গ্রামে জানিয়ে দেন। দ্বারিকাতে এখন আটপৌরী হলেন লক্ষ্মী বাগ্দী।
দ্বারিকা বাসস্ট্যান্ডের কাছে গ্রামের একমাত্র দুর্গামেলার দালান মন্দিরটি। প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে এখানে দুর্গাপূজা হচ্ছে। মন্দিরের কাছেই বাড়ি রত্না সরকারের। তিনিই স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই পূজা শুরু করেন। বছর দশেক আগে মন্দিরটি পাকা বাড়ি নির্মাণ হয়েছে। দ্বারিকার প্রাচীন দেবস্থান হল কালীতলা। পিউ পালের কাছ থেকে এ সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে, এখানে হুবহু তুলে দিচ্ছি-
"কীর্তনা পুকুরের পাড়ে এই অতি প্রাচীন চামুণ্ডা মূর্তিটি রয়েছে। এটি আনুমানিক এক-দেড় হাজার বছর আগের। কোনও একটি পুকুর থেকে এক নাপিত এই প্রস্তর প্রতিমাটি পেয়েছেন আজ থেকে ৩০০-৪০০ বছর আগে।"
সুতরাং দ্বারিকা গ্রাম কত প্রাচীন এই পুরাকীর্তিটি তার প্রমাণ।
১৪০৯ বঙ্গাব্দের ১০ আশ্বিন মায়ের মন্দিরটির পুনর্নির্মাণ ঘটে। এই মন্দিরেই একটি শিবলিঙ্গ প্রোথিত আছে- তিনি বাণলিঙ্গ। কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন। আর আছে মাটির হাতি-ঘোড়া। কালীমন্দিরের পাশে একটি মনসার থান আছে। কালীমন্দিরের বর্তমান পূজারীর নাম লক্ষ্মণ চক্রবর্তী। অতীতে কুচীল চক্রবর্তী, ত্রিপুরা চক্রবর্তী পূজক ছিলেন। মন্দিরের সামনে একটি আটচালা আছে। দ্বারিকা গ্রামের সম্পদ হল এখানকার নবরত্ন টেরাকোটা মন্দিরটি। এটিই 'দোল মন্দির' নামে গ্রামবাসীর কাছে পরিচিত।
নবরত্ন মন্দিরটি লক্ষ্মী-জনার্দনের। সামনের অংশে সুদৃশ্য অলঙ্করণ ছিল পোড়ামাটির দৃশ্যশোভিত। তা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় মন্দিরটির সংস্কার ঘটে এবং সিমেন্টের পলস্তরা করে দেওয়া হয়। প্রবেশমুখে তিনটি খিলান আছে। মূল প্রবেশপথের ওপরে পোড়ামাটির লক্ষ্মী নারায়ণের সেবাদৃশ্য এখনও রয়েছে। বাকি দুটি ভেঙে যাওয়ায়, সিমেন্টের টিয়া পাখিদের মধুর মিলনদৃশ্য বানানো হয়েছে। ওপরে ষোলোটি এবং নীচে ৭+৮+৮+৭টি প্যানেল আছে ওপর-নীচ দু-পাশে। মন্দির লিপিটি সংস্কারের সময় ঢাকা পড়ে গেছে। গ্রামবাসী জানান, এটি ১২১০ সালের পর তৈরি। মন্দিরটির ভিত্তিপীঠ তিন ফুট উঁচু। দৈর্ঘ্যে প্রায় ১২ ফুট, প্রস্থে ১২ ফুট ২ ইঞ্চি, উচ্চতা প্রায় ২০ ফুট। চুনবালির নকশি কাজ ও অলঙ্করণ চূড়া পর্যন্ত রয়েছে।
তথ্যসূত্র:
১. চর্যাপদটির অর্থ-উদ্ধার প্রসঙ্গে নতুন ইঙ্গিত। অরবিন্দ চট্টোপাধ্যায়। এবং জলঘড়ি। ২/১, ডিসেম্বর ২০১৯- মার্চ ২০২০।পৃ.৪১-৪২
২.কপিলামঙ্গল। ভারবি, কলকাতা। জানুয়ারি, ২০১৭। পৃ. ৬৭
৩. সিদ্ধেশ্বর পণ্ডিতের সাক্ষাৎকার, বীরসিঙা, পশ্চিম মেদিনীপুর, ১৫ নভেম্বর, ২০২৪
৪. পরবর্তী সংখ্যায় এই আলোচনা প্রকাশিত হবে।
৫. পিউ পাল, পিতা-মৃত্যুঞ্জয় পাল, দ্বারিকা, বাঁকুড়া। মার্চ, ২০১৯
সাহায্য: পিউ পাল, দ্বারিকা।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment