Tuesday, 9 June 2026
মেগাস্থিনিসের ভারত ভ্রমণ। রজনীকান্ত গুহ মহাশয় ১৮৮৮ সালে। কলকাতা থেকে সেই বই প্রকাশিত হয়েছিল।
মেগাস্হিনিসের ভারত ভ্রমণ
কাল থেকে খুব চমৎকার একটি বই পড়ছিলাম। গ্রীক ভ্রমণকারী মেগাস্থিনিসের ভারত ভ্রমণ।
আজ থেকে প্রায় 2400 বছর আগে মেগাস্থিনিস ভারতে এসেছিলেন। তখন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য প্রবল পরাক্রমে ভারত বর্ষ শাসন করছেন। রাজধানী ছিল পাটলিপুত্র যা আজকের পাটনা নগর। গ্রিসের সম্রাট সেলুকাস ,মেগাস্থিনিস কে ভারতে পাঠিয়েছিলেন চন্দ্রগুপ্ত র কাছে তাঁর দূত হিসেবে।
মেগাস্থিনিস এর লেখা মূল যে বইটি তার নাম হলো Ta Indica , সেটি কিন্তু আর পাওয়া যায় না। হয় হারিয়ে গেছে অথবা নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু সুখের কথা এই যে সেই বই থেকে পরবর্তীকালে আরো অসংখ্য ভারত ভ্রমণকারী তাঁদের নিজেদের বইতে অনেকটা করে অংশ অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন বা পুর্নলিখন করেছিলেন।
সেই সব টুকরো টুকরো অংশগুলো জোড়া দিয়ে দিয়ে জার্মান অধ্যাপক ও গবেষক শোয়ানবেক ১৮৪৬ সালে মেগাস্থিনীস ইন্ডিকা নামের মূল বইটি রচনা করেন।
সেই বইটার ই বাংলা অনুবাদ করেছিলেন তৎকালীন বরিশাল বাসী পন্ডিত মানুষ সাম্প্রতিক খড়ি প্রকাশনী খড়ি প্রকাশনী সেই বইটি আবার পুনর্মুদ্রণ করে একটি খুব দরকারী কাজ করেছেন।
সত্যি কথা বলতে কি এই বইটি পড়তে খুব অদ্ভুত লাগে, সব কথা যেন বিশ্বাসই হতে চায় না। অদ্ভুত এই কারনে লাগে যে মেগাস্থিনিস এমন কিছু তখনকার ভারত সম্বন্ধে বিবরণ দিয়েছেন যা আজকের দিনে দাঁড়িয়ে অকল্পনীয় মনে হয়।
যেমন মেগাস্থিনিস বলেছেন যে ভারতে নাকি এমন অনেক লোক ছিল যাদের মুখ ছিলনা। তারা নাকি গন্ধ শুঁকে নাকি বেঁচে থাকত, মুখ নেই বলে খাবার খেত না। আবার আরো এক ধরনের নাকি লোক ছিল যাদের কান বিরাট সাইজের হতো। কোন এক শ্রেণীর মানুষের নাকি সবারই একটি করে পা থাকতো। এসবের সত্যতা প্রমাণ করা আজকের দিনে প্রায় অসম্ভব।
অনেক রকম অদ্ভুত জন্তুর কথাও লিখেছেন। শিয়ালের মতো সাইজের নাকি এক রকমের পিঁপড়ে ছিল যারা স্বর্ণ খনি থেকে সোনার রেনু মুখে করে বার করে আনতো। একশৃঙ্গ এক ধরনের প্রাণীর কথাও লিখেছেন। যুদ্ধের ক্ষেত্রে বিশেষত হাতিদের খুব কদর ছিল। ভারতীয় হাতিদের সাই জ নাকি লিবিয়ার হাতিদের চেয়েও বড় ছিল। এবং যুদ্ধে তারা মারাত্মক হয়ে উঠতো। যুদ্ধের আগে হাতিদের মদ খাওয়ানো হত। হাতিরা খুব গন্ধ ভালবাসতো। তারা পছন্দ মত গন্ধের ফুল সংগ্রহ করে আনতো যা তাদের চারদিকে ছড়িয়ে দেয়া হতো।
উনি এই দেশের সমাজ ও মানুষ সম্বন্ধে খুব উঁচু ধরনের প্রশংসা করে গিয়েছেন। উনি বলেছেন এই দেশ কখনো কাউকে আক্রমণ করেনি। তখন সারা পৃথিবীতে ক্রীতদাস প্রথা খুবই স্বাভাবিক হিসেবে গণ্য হত কিন্তু এই দেশে কোন ক্রীতদাস ছিলনা। মানুষ খুবই সহজ-সরল ছিল। সবাই সবাইকে এতটাই বিশ্বাস করত যে কেউ কাউকে টাকা ধার দিলে কোন কাগজপত্রে সই সাবুদ নেওয়া হত না। লোকের মুখের কথাই যথেষ্ট ছিল। চুরি প্রায় ছিল না বললেই চলে।
সমাজে ৪-৫ রকমের জাতিভেদ ছিল। তার মধ্যে একটা খুব বড় সংখ্যায় ছিল কৃষকেরা। উনি একটা খুব দারুণ কথা বলেছেন যে পৃথিবীর অন্য জায়গায় যখন একটি দেশ অন্য একটি দেশকে আক্রমণ করে তখন সেই দেশের কৃষি জমিকেও জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু ভারতে যুদ্ধের সময়তেও পরাজিত দেশের কৃষি জমি অথবা কৃষকের কোন ক্ষতি করা হত না। কেননা তাতে দেশের শস্য ভান্ডারেই টান পড়বে।
দেশে শিল্পীদের খুব সম্মান ছিল। কারুর মাথার চুল কেটে নেয়া সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল। মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ ছিল। তার জন্য মৃত্যুদণ্ড অবধি দেয়া হতো।
পুরুষেরা বহুবিবাহ করতেন। আবার রাজার সৈন্য দলে নারী সৈনিকরা ও থাকতেন।। রাজা যখন শিকারে যেতেন সশস্ত্র নারী সৈনিকেরা আগে আগে যেতেন। রাজা সারা দিনে ঘুমোতে পারতেন না। এমন কি রাতেও কিছুক্ষণ অন্তর অন্তর ষড়যন্ত্রের ভয় তাঁকে বিছানা পাল্টে পাল্টে শুতে হতো।
এই বইতে মেগাস্থিনিস একজন সন্ন্যাসীর একটি অসাধারণ কাহিনী র কথা লিখেছেন। গল্প নয় সত্য ঘটনা।
সেই সময় একজন সন্ন্যাসী ছিলেন যার নাম ছিল দণ্ন্দ্বমিশ। তিনি পর্ণ শয্যায় শয়ন করতেন , অরণ্যের ফলমূল খেতেন , ঝর্নার জল পান করতেন। তাঁর অসাধারণ জ্ঞান ও ক্ষমতার কথা তখনকার গ্রিক সম্রাট আলেকজান্ডার দি গ্রেট এর ও কানে পৌঁছয়। আলেকজান্ডার তাঁকে সৈন্য দিয়ে ডেকে পাঠান তাঁর সঙ্গে দেখা করতে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
আলেকজান্ডারের সৈন্যরা যখন তাঁকে গিয়ে বলে যে আপনি আমাদের সঙ্গে এখনই সমস্ত পৃথিবীর অধীশ্বর সম্রাট আলেকজান্ডারের সঙ্গে দেখা করতে চলুন। সম্রাট বলেছেন তিনি আপনাকে যথেষ্ট সমাদর করবেন।
সন্ন্যাসী আলেকজান্ডারের বার্তাবাহকের কথা কিছু মাত্র পাত্তা না দিয়ে সেই পাতার শয্যায় শুয়ে শুয়ে ই বলেন যে দ্যাখো, সন্ন্যাসীর আবার সম্রাট কে? আমারও যে রাজা ওই আলেকজান্ডারের ও সেই একই রাজা। তিনি হলেন স্বয়ং ঈশ্বর। না তোমার সম্রাট কে আমার প্রয়োজন না তার দেওয়ার সমাদরের আমার কিছু মাত্র দরকার আছে।
এই পার্থিব পৃথিবীর কোন কিছুর প্রতি আমার কোন আকর্ষণ নেই। আমার যা দরকার তার জন্য যথেষ্ট ফলমূল ও পানীয় জল প্রকৃতি আমায় দেয়।
আলেকজান্ডারের সৈন্যরা ভয় দেখায় যে সম্রাটের সঙ্গে না দেখা করতে গেলে সন্ন্যাসীর প্রাণদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
সন্ন্যাসী উত্তরে বলেন যে তাহলে তো বরং ভালোই হয়। আমি এই জীর্ণ বস্ত্রের মতো শরীরটাকে পরিত্যাগ করে ঈশ্বরের কাছে চলে যেতে পারবো। কেননা, শরীরের বিনাশ হয় কিন্তু আত্মার তোকোন বিনাশ হয় না।। তুমি গিয়ে তোমার সম্রাট কে জানিয়ে দাও যে সন্ন্যাসী বলেছেন উনি আসতে পারবেন না।
আলেকজান্ডার পরে গিয়ে নিজে ওনার সঙ্গে দেখা করেছিলেন ও যথাযথ সম্মান দিয়েছিলেন।
এটা প্রমাণ করে যে তখনকার দিনেও কিছু মানুষ ছিলেন যারা সিস্টেমকে ভয় পেতেন না।
এই বইটাতে একটাই শুধু একটু অসুবিধা হয়। সেটা হলো বারবার একই কথা বলা হয়েছে। মূল লেখাগুলির প্রতি তথ্যনিষ্ঠ থাকতে গিয়ে যেখানে যিনি যা নিয়েছেন মেগাস্থিনিসের মূল লেখা থেকে সেটাকেই উনি নিজের বইতে স্থান দিয়েছেন। একই তথ্য বারবার এসেছে।
দ্বিতীয় কথা পাঠক হিসেবে আরও কিছু জানার ছিল আমাদের। যেমন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য মানুষ কেমন ছিলেন। অথবা তাঁর গুরু চাণক্য কৌটিল্য। মৌর্য রাজ সভা কেমন ছিল। এসব প্রশ্নের উত্তর পেলাম না।
আমার মনে হয় এই বইটির অবিলম্বে একটি কিশোর সংস্করণ প্রকাশ করা উচিত। তাহলে আজকের ছোটরা আমাদের দেশের ইতিহাসকে জানতে শিখবে। বইটির দাম ৩৫০ টাকা।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

No comments:
Post a Comment