Friday, 8 May 2026

Chalar pather chalandar by Mihir Sengupta

তপনদা বরিশালকে কোনোদিন ভোলেননি। তার ‘বাঙালনামা’ লিখতে গিয়ে লেখাটা দুনিয়ানামা বা বিশ্বনামা হয়ে গিয়েছিল। কারণ, গোটা পৃথিবীই একসময় তাঁর কাছে বরিশাল হয়ে উঠেছিল। ২০০০ সালে কলকাতা এসে একদিন ফোনে বললেন, ‘তোমাদের হাসিদির এত দিনেও শ্বশুরবাড়ির ভিটে দেখা হয়ে ওঠেনি। কোনো ব্যবস্থা করতে পারো?’ বললাম, আমি তো প্রতিবছরই একবার দুবার যাই। এবার চলুন না ফেব্রুয়ারি মাসে যাই বরিশালে। আমি সঙ্গে থাকলে আপনাদের অসুবিধে হবে না আশা করি।’ ‘তাই ভাবছিলাম। তবে ভিসা টিসার ব্যবস্থা তোমাকেই করতে হবে। আমাদের কিন্তু আবার ব্রিটিশ পাসপোর্ট।’ বললাম, ‘দালাল ধরে করিয়ে নেব। তবে খরচ একটু বেশি।’ ঠিক হলো, আমি কয়েকদিন আগেই তাঁদের একদার “নিজ মৌজা” কীর্তিপাশা যাব। কাছেই আমার কুটুম্ববাড়ি। সেখানে উঠে তপনদার পৈতৃক প্রাসাদ দর্শন করানোর ব্যবস্থা করব। প্রাসাদের সামনের অংশের দোতলার হলঘরে এখন একটা মেয়েদের ইশকুল। নিচের অংশে ইশকুলের অফিস, শিক্ষকদের বসার ঘর, এইসব। এছাড়া বাড়ির সামনের দিকে তপনদার ঠাকুরদার পিতৃনামে প্রতিষ্ঠিত প্রসন্নকুমার উচ্চ বিদ্যালয়। ইশকুলের সামনে প্রকাণ্ড ফুটবল মাঠ এবং একদিকে একটি বেশ বড় দিঘি। মাস্টারমশাই এবং ইশকুল কর্তৃপক্ষের সবার সঙ্গে যোগাযোগ করে সেই মাঠে এবং প্রাসাদের হলঘরে দুটি আলাদা সভার বন্দোবস্ত করা হলো। মধ্যাহ্নভোজন আমার শ্বশুরালয়ে। তপনদার বাবার নাম কৌলিকভাবে অমিয় সেন। ডাকনাম স্থানীয় পরম্পরায় চাঁদবাবু। রায়চৌধুরী উপাধি নাকি নবাবি আমলের। কেউ ব্যবহার করেন, কেউ করেন না। তাঁদের জমিদারির দুটি ভাগ— বড়ো হিস্যা এবং ছোটো হিস্যা। একদা একত্রিতই ছিল। পরবর্তীকালে বিভক্ত। প্রাসাদের মাঝখানের দেয়ালটা তপনদার ভাষায় বর্ণনায় ‘বার্লিন ওয়াল’। দুটো অংশই এখন বেশিরভাগ খণ্ডহর বা ধ্বংসস্তূপ। শুধু বড় হিস্যার সামনের অংশটি অট্টালিকা প্রাসাদত্বের অহংকার এখনও ঘোষণা করে চলেছে। এ প্রসঙ্গে খুঁটিনাটি অনেক কিছুই বর্ণনীয় থাকলেও নিষ্প্রয়োজনে রচনা প্রলম্বিত করছি না। তপনদার কাছে লেখা সেই সুদীর্ঘ পত্র নিবন্ধটি যেটি তাঁর রোমন্থন-এর দ্বিতীয় সংস্করণেও অঙ্গীভূত হয়েছে, সেখানে পাওয়া যাবে। নামকরণ করা হয়েছিল ‘আহ্লাদে ফাউকানো অথবা ভাটিপুত্রর পত্র বাখোয়াজি’। তপনদা আমাকে বলে দিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত ব্যারিস্টার কামরুল হাসান সাহেবকে ঢাকায় যোগাযোগ করে জলপথে বরিশাল আসার ব্যবস্থা করে রাখতে। তিনি এয়ারে হাসিদি সহ ঢাকা গিয়ে তাঁর অতিথি হবেন। পরের দিন বরিশালে আমি তাঁদের রিসিভ করে গাড়িতে কীর্তিপাশা নিয়ে আসব। ফোন মারফত কামরুল হাসানকে যোগাযোগ করতে তিনি জানালেন, জলপথে ভালো ব্যবস্থা করা যায়নি। তপনদারা ঢাকা-বরিশাল প্লেনে আসবেন। আমি আমার কুটুম্বদের নিয়ে ঝালকাঠি শহরে তাঁদের নৈশবাসের ব্যবস্থা করে তাঁদের আসার আগের দিন ঝালকাঠিতেই রাত কাটালাম। পরদিন ভোরে গাড়ি নিয়ে চলে গেলাম বরিশাল এয়ার স্টেশনে। তাঁরা এলেন। পথে বললেন, ‘কালকে ঢাকা ফেরার ব্যবস্থাটা কী করবে?’ জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার ইচ্ছে কী?’ ‘বহুকালের শখ, সেই ছোটোবেলার “ইস্টিমার”, ওই যে ফ্লেমিংগো কোম্পানি টোম্পানির জাহাজ টাহাজ তার একটায় আর একবার অন্তত ভ্রমণ করা।’ হায়রে বাঙালের নস্টালজিয়া! হায়রে হারানো ফুরোনো দিনকে ফিরে দেখার বা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা!! তা তো দেখছি কাউকেই ছাড়ে না! তবু ভাগ্য ভালো যে তপনদা জ্যোতিঠাকুরের মিনিমাত্রা ইস্টিমারে চাপার বায়না ধরেননি। বললাম, ‘স্টিমার সার্ভিসের চল এখন খুব একটা নেই। একটা স্টিমার অনিয়মিতভাবে চলে। তবে সেটা ফ্লেমিঙ্গের নয়। ব্যবস্থা একটা করেছি। কাল সন্ধেয়। কিন্তু আমি সঙ্গে থাকব না। গ্রামে আর কয়েকটা দিন কাটিয়ে বাসে ফিরব।’ ‘কীভাবে ঠিক করলে?’ ‘পুষ্প, মানে আমার এক বন্ধুর বোন বরিশালে থাকে। ওর বর খুব বড় উকিল এখানে। ওই পুষ্পর ঘাড়ে দায়িত্ব চাপিয়েছি। কোনো অসুবিধে হবে না। সে একেবারে ‘থাকিবার, খাইবার, শুইবার সুবন্দোবস্ত, সুন্দরী স্ত্রীর সহিত একত্র বন্দোবস্ত।’ তবে শর্ত আছে। কাল, আমাদের সবার পুষ্পর বাসায় মধ্যাহ্নভোজ খেতে হবে। তবে আমার অভিজ্ঞতা, ব্যাপারটা ভয়াবহ। ওর বর যেমন খায়, তেমন খাওয়ায়। ‘সামান্য দশ পদ মাছ’ ছাড়া তার আয়োজন মোটামুটিও হয় না।’ তপনদা বললেন, ‘খাইছে।’ সুদীর্ঘ পরবাসেও বিশুদ্ধ ‘চান্দ্রদ্বীপি’ তাঁর সঙ্গ ছাড়েনি। পথঘাট তাঁর স্মৃতির ছবির অনুসারী ছিল না। তা থাকার কথাও এত দিনের পর থাকে না। বছর পঞ্চাশেক আগে নাকি একবার এসেছিলেন। তবে কীর্তিপাশার বাড়িতে যাননি। বরিশাল স্টিমার ঘাটের কাছে ‘নাবালক লজ’টা তখনও দেখতে পেয়েছিলেন। কাল ফেরার পথে দুটো জায়গায় যাওয়ার ইচ্ছে। নাবালক লজ এবং জিলা ইশকুলটা, তপনদার প্রপিতামহের শিশু বয়সে এক প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে তাঁর (অর্থাৎ প্রপিতামহের) পিতা রাজকুমার বিষপ্রয়োগে নিহত হন। তাঁর স্ত্রী ‘সতী’ হয়েছিলেন। পরিবারে তখন মাৎস্যন্যায়ী অনাচার। তৎকালীন ব্রিটিশ জেলা শাসক নাবালক প্রসন্নকুমারের দায়দায়িত্ব এবং বিষয় সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ স্বহস্তে গ্রহণ করে তাঁকে সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলেন। জমিদারি এস্টেটটি তদবধি ‘নাবালক বাবুর এস্টেট’ এবং তাঁর বড় হয়ে ওঠার পরের বরিশালস্থ বাসস্থানটির নাম হয় ‘নাবালক বাবুর লজ’। বরিশাল-ঝালকাঠি রোড ধরে যাবার সময় তপনদা সেদিন এইসব গল্প শোনাচ্ছিলেন। অবশ্য এসব গল্প তার বটঠাকুরদা রোহিণী কুমারের ‘বাক্কা’ গ্রন্থে আমি আগেই পড়েছিলাম। গল্পের মধ্যে, মাঝে মাঝে তিনি এবং আমি ‘ফুট’ কেটে চলেছিলাম। হাসিদি হাসছিলেন। মজা করে বলেছিলাম, ‘হাসিদি, আপনি ওই পরিবারে আসার পরেই কি তপনদারা সাবালক হলেন?’ হাসিদি বললেন, ‘কি জানি? পুরোটা বোধ হয় এখনও হননি। দেখো না, কথাবার্তার শ্রী। যেমন কথায়, তেমন লেখায়।’ তপনদা বললেন, ‘অনেক পুরুষের অভ্যেস তো, তা ছাড়া এস্টেটের অন্ন কিছুটা হলেও তো খেয়েছি, এস্টেটটা গেছে, কিন্তু নাবালকত্বটা রয়েই গেছে। ওটা সামন্ত-আভিজাত্য। তুমি ঠিক বুঝবে না।’ হাসিদি বলেছিলেন, ‘ভাগ্যিস্! বুঝলে তোমারই মুশকিল হতো।’ গাড়ি আস্তে চলছিল। মাঝে মাঝে দাঁড় করিয়ে তপনদা হাসিদিকে নদী, পথঘাটের বিশেষ বিশেষ জায়গার স্মৃতি-ইতিহাস বলছিলেন। কোনটা কালিজিরা নদী, সেটাই প্রাচীন সুগন্ধার অবশেষ কি না, বর্তমান ঝালকাঠি নদীটাই শেষতক সুগন্ধার স্মৃতিবাহী নদী কি না— এইসব। ইশকুল জীবনে, নাবালক লজ থেকে বাড়ি যেতেন সাইকেলে। সঙ্গে থাকতেন একজন ইংরেজ সাহেব— পারিবারিকভাবে পরিচিত, কী যেন নাম— ভুলে গেছি। বরিশালি ভাষায় দক্ষতা ছিল। তপনদা বললেন, ‘এইসব জায়গায় হঠাৎ সাইকেল থামিয়ে নেমে পড়ে সাহেব একপাক নেচে, গেয়ে নিত- ‘আইজ ঠাকুমার রান্ধন খামু।’ ঠাকুমা নাকি রন্ধনে দ্রৌপদী, তপনদা বলেছিলেন। হাসিদি জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘বাকিটা?’ হাসিদি ঠাকুমার পতির সংখ্যাটা দ্রৌপদী প্রসঙ্গে ইঙ্গিত করেছিলেন। আমি বলেছিলাম, ‘পরিবারে কিন্তু প্রসন্নবাবুর মা এবং ঠাকুমা দুজন ‘সতী’ হয়েছিলেন, সামলে কথা বলবেন। গেলে, দু-দুখানা সতীস্থান দেখতে পাবেন।’ আমাদের রাস্তা গিয়ে তার অ্যাসফল্টত্ব হারাল কীর্তিপাশা বাজারের বিপরীত পারে এক ব্রিজের গোড়ায়। ব্রিজটা কংক্রিটের না হলেও তার ওপর দিয়ে গাড়ি যাবে। ওপার থেকে বাজারের শুরু। তার মাঝখান দিয়েই রাস্তা। কিন্তু এখন সংকীর্ণ। গাড়ি আস্তে আস্তে চলল। এই বাজার, রাস্তা এবং এলাকা তপনদাদের ‘নিজমৌজা’, একেবারে নিজস্ব ভূমি। কম করে আশপাশ দশগ্রামের মানুষ হাজারে হাজারে ভিড় করে রাস্তা প্রায় অবরুদ্ধ করে ফেলেছে। হাসিদির হাঁটুতে আর্থারাইটিস। হেঁটে যেতে পারবেন না। পুষ্পকে বললাম, ‘তুই হাসিদির দায়িত্বে থাক। আমি তপনদাকে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছি’। সঙ্গে অবশ্য ঝালকাঠি থেকে আমার বড় শ্যালিকাও ছিলেন। ওঁরা গাড়িতেই ইশকুলের মাঠ অবধি যাবেন। তপনদা বললেন, ‘এ বেশ হলো। পথি নারী আবর্জনা।’ অবশ্য নারীরা কথাটা শোনেননি। তাহলে আবর্জিতা বোধে বিবর্জিতা টের পাইয়ে দিতেন। বললাম, ‘পুষ্প কিন্তু বরিশালের মহিলা সমিতির নেত্রী।’ তপনদা বললেন, ‘বাবারে!’ কিন্তু হাঁটার উপায় নেই। কীর্তিপাশা এখনও হিন্দুপ্রধান গ্রাম। উত্তরের বিস্তীর্ণ বিল অঞ্চলের গ্রামগুলো নমঃশূদ্র সমাজ অধ্যুষিত। অন্যান্য গ্রাম সবই মুসলমানপ্রধান। বাজারসংলগ্ন বসতির অধিকাংশ— সবই মুসলমান প্রধান। বাজারসংলগ্ন বসতির অধিকাংশ মানুষ কর্মকার সমাজের। এঁরা শিক্ষা সংস্কৃতিতে খুবই উন্নত, যদিও এখন আর আগের ব্যাপকতা নেই। তথাকথিত শিক্ষিত হিন্দু উচ্চবর্ণীয় ভদ্দরলোক প্রায় নেই এবং ভাগ্যিস্! মানুষগুলো সব বয়স ধর্ম নির্বিশেষে রাস্তায় পড়ে সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করছে তাদের একদার রাজপুত্রকে। তপনদার দুচোখে অঝোর ধারা। মানুষটিকে কোনো দিন আদৌ আবেগপ্রবণ দেখিনি। একজন একজন করে বুকে জড়িয়ে ধরে এখন কাঁদছেন। এই কান্নার অর্থ বা মাহাত্ম্য সবাই বুঝবেন না। এটা তিনি নিশ্চয় বোঝেন নিজে, কারণ তিনি ‘রোমন্থনের কবি’, আর বুঝি আমি, কারণ ওই সময়টায় আমি ‘বিষাদবৃক্ষ’ রচনার দুর্মর প্রহরগুলো কাটাচ্ছিলাম। এটা ২০০০ সাল, ২০০৩ এ ‘বিষাদবৃক্ষ’ তার পুস্তকশরীর পাবে। আমি বিষাদবৃক্ষের কবি হব। হঠাৎ একজন কাঁচা-পাকা দাড়িওলা প্রৌঢ়কে দেখে তপনদা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘আরে ভুডি, তুমি তো দেখি এক রকমই আছ।’ বুঝলাম, তপনদার ভুল হয়েছে। ‘ভুডি’ অর্থাৎ ভুডি গাজিকে আমিও চিনতাম। তিনি সেই সময়ের প্রায় পঁয়তিরিশ-চল্লিশ বছর আগে মারা গেছেন এবং বৃদ্ধ বয়সেই। যাকে তপনদা ভুডি বলে জড়িয়ে ধরেছেন, সে ওই ভুডি গাজিরই কনিষ্ঠপুত্র, সিদ্দিক গাজি। ও আমার চাইতে বয়সে কিছু বড় হলেও, আমাদের সঙ্গে ইশকুলে পড়ত। কথাটা একটু ফাঁকায় এসে তপনদাকে বলতে, বললেন, ‘তাই তো, কিন্তু ও যে একদম ওর বাপের চেহারা-অবিকল।’ বললাম, ‘সবায়’ নিরুত্তিয়াতে বলুন, ‘একদম’ নয়— ‘একছের’, এখানে আমি কইলকাইয়া কথা কই না।’ সেবারে, বহুকাল বাদে, কীর্তিপাশার বড় হিস্যার প্রাসাদের সামনে একটা বড় রকমের খুশির উৎসব যেন ভেঙে পড়েছিল। ওই রকম গ্রামে এত জনসমাগম রাজনৈতিক সভা সমাবেশেও হয় না। ইশকুলের সামনের মাঠে মঞ্চ বাঁধা হয়েছিল প্রকাণ্ড। রাস্তায় পর পর অন্তত তিনটি তোরণ সজ্জিত করা হয়েছিল। ইশকুলের ছেলেমেয়েরা, শিক্ষকেরা একের পর এক এসে প্রণাম করছিল বর্গবর্ণ নির্বিশেষে। একটি কিশোরী গান গেয়ে বরণ করল, ‘ঝরাফুলদলে কে অতিথি, এলে সাঁঝের বেলায় কানন বীথি।’ তপনদা বক্তৃতায় বললেন, ‘আমার অনুজপ্রতিম মিহিরের কল্যাণে এই তীর্থ দর্শন আমাদের সম্ভব হয়েছে। আপনাদের সকলকে আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা এবং প্রণাম। মিহিরকে আশীর্বাদ।’ আমার নামটার অহেতুক উল্লেখে আমি গৌরবান্বিত বোধ করেছিলাম। অস্বস্তিও।

No comments:

Post a Comment