RESEARCH CONSULTATION-INTERVIEW INTERPRETER ASSISTANCE-BOOK ACQUISITION IN INDIA & ABROAD ON DEMAND
Wednesday, 2 September 2026
SUKUMARI BHATTACHARYA
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস কেবল তার ছাত্র আন্দোলন, রাজনৈতিক উত্তাপ কিংবা অ্যাকাডেমিক সাফল্যের ইতিহাস নয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত ঐতিহ্য তৈরি হয়েছে এমন কিছু শিক্ষক ও চিন্তকের হাতে, যাঁরা জ্ঞানচর্চাকে নিছক পরীক্ষার বিষয় না বানিয়ে তাকে প্রশ্ন করার, যুক্তি দিয়ে বিচার করার এবং সমাজকে নতুনভাবে বোঝার হাতিয়ার করে তুলেছিলেন। সেই ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থপতি ছিলেন বিশিষ্ট ভারততত্ত্ববিদ, সংস্কৃতজ্ঞ, সমাজ-বিশ্লেষক ও অধ্যাপক সুকুমারী ভট্টাচার্য। ব্যক্তিগত জীবনে প্রগতিশীল বামপন্থী দর্শনে বিশ্বাসী এই বিদুষী প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য, বেদ ও পুরাণকে অলৌকিকতার আবরণ থেকে বের করে ইতিহাস, সমাজ, অর্থনীতি, শ্রেণি এবং লৈঙ্গিক সম্পর্কের আলোকে বিশ্লেষণ করেছিলেন। তাঁর কাছে অতীত কোনো পবিত্র, অপরিবর্তনীয় বস্তু ছিল না, বরং তা ছিল মানুষ এবং সমাজের তৈরি এক ঐতিহাসিক বাস্তবতা, যাকে প্রশ্ন করে, যুক্তি দিয়ে এবং প্রমাণের ভিত্তিতে বোঝা প্রয়োজন।
১৯২১ সালের ১২ জুলাই কলকাতায় তাঁর জন্ম। খ্রিস্টান পরিবারে জন্ম নেওয়া এক তরুণী হিসেবে তাঁর শিক্ষাজীবনের শুরুটাই ছিল তৎকালীন সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক গোঁড়ামির সঙ্গে সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে। ১৯৪২ সালে সংস্কৃতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে তিনি স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। কিন্তু সংস্কৃতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পথে তাঁকে বাধার মুখে পড়তে হয়। তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে সংস্কৃত কেবল একটি ভাষা বা বিদ্যার বিষয় ছিল না, অনেকের কাছে তা ছিল একটি নির্দিষ্ট সামাজিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর একচেটিয়া অধিকার। সেই ব্যবস্থার মধ্যে খ্রিস্টান পরিবারের এক তরুণীর সংস্কৃত নিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের আকাঙ্ক্ষা সহজে মেনে নেওয়া হয়নি। কিন্তু এই বাধা তাঁর জ্ঞানস্পৃহাকে দমাতে পারেনি। সাময়িকভাবে নিজের গতিপথ পরিবর্তন করে তিনি ইংরেজি সাহিত্যে এমএ সম্পন্ন করেন। পরে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে সংস্কৃত সাহিত্যেও এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। যে জ্ঞানকে সমাজের একটি অংশ নিজের একচেটিয়া সম্পত্তি বলে মনে করেছিল, শেষ পর্যন্ত নিজের মেধা, অধ্যবসায় ও জেদের জোরে সেই জ্ঞানের দরজাই তিনি নিজের জন্য খুলে নেন। পরবর্তী জীবনে প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্র ও সমাজ নিয়ে তাঁর যে নির্ভীক প্রশ্ন করার ক্ষমতা দেখা যায়, তার সঙ্গে এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার একটি গভীর সম্পর্ক ছিল বলেই মনে হয়।
সুকুমারী ভট্টাচার্যের কর্মজীবনের সঙ্গে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক ছিল গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী। ১৯৫৭ সালে প্রখ্যাত কবি ও অধ্যাপক বুদ্ধদেব বসুর আমন্ত্রণে তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরবর্তীতে বিশিষ্ট পণ্ডিত সুশীল কুমার দে-র আমন্ত্রণে তিনি সংস্কৃত বিভাগে যোগ দেন এবং দীর্ঘকাল সেখানে অধ্যাপনা করেন। যাদবপুরের মুক্তচিন্তা, বিভিন্ন জ্ঞানশাখার মধ্যে সংলাপ এবং প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে প্রশ্ন করার যে পরিবেশ ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছিল, সুকুমারী ভট্টাচার্যের মতো একজন চিন্তাবিদে'র হাতে তা নতুন মাত্রা পায়। তিনি শুধু যাদবপুরের পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেননি, বরং নিজের শিক্ষাদর্শ দিয়ে সেই পরিবেশকে আরও শক্তিশালী করেছিলেন। তাঁর কাছে সংস্কৃত কেবল ব্যাকরণ, অলঙ্কার, কাব্য কিংবা ধর্মীয় শাস্ত্র মুখস্থ করার বিষয় ছিলনা, প্রাচীন পুঁথি তাঁর কাছে ছিল একটি সমাজের দলিল। বেদ, উপনিষদ, মহাকাব্য বা পুরাণ পড়ার সময় তিনি জানতে চাইতেন, এই গ্রন্থ কোন সমাজে তৈরি হয়েছিল, সেই সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থা কেমন ছিল, সম্পদের মালিকানা কার হাতে ছিল, নারী ও পুরুষের সম্পর্ক কেমন ছিল, কোন শ্রেণি ক্ষমতা ভোগ করত এবং কার কণ্ঠস্বর সেই শাস্ত্রে অনুপস্থিত।
এই জায়গাতেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতচর্চায় তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। তিনি সংস্কৃতকে পুণ্য অর্জনের ভাষা হিসেবে নয়, ইতিহাসকে বোঝার একটি বৈজ্ঞানিক উপকরণ হিসেবে ছাত্রদের সামনে তুলে ধরেছিলেন। তাঁর ক্লাসে কোনো প্রাচীন শাস্ত্রকে কেবল শ্রদ্ধার সঙ্গে পাঠ করলেই কাজ শেষ হয়ে যেত না। বরং সেই শাস্ত্রের বক্তব্যকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিচার করতে হত, তার মধ্যে নিহিত সামাজিক সম্পর্ককে বিশ্লেষণ করতে হত এবং প্রয়োজনে তার বিরুদ্ধেও প্রশ্ন তুলতে হত। শিক্ষকই শেষ কথা, এমন ধারণা তাঁর ক্লাসরুমে জায়গা পেত না। ছাত্ররা প্রশ্ন করত, তর্ক করত, আপত্তি তুলত এবং সুকুমারী ভট্টাচার্য সেই প্রশ্নকে নিরুৎসাহিত না করে আরও উৎসাহ দিতেন। তাঁর কাছে একজন ছাত্রের সাফল্য শুধু কতটা মুখস্থ করতে পেরেছে তার ওপর নির্ভর করত না, বরং কতটা স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শিখেছে, তার ওপর নির্ভর করত। এই কারণেই তাঁর ক্লাসরুম ছিল কেবল সংস্কৃত শেখার জায়গা নয়, সমাজকে বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করতে শেখার জায়গাও।
তাঁর গবেষণার মূল শক্তি ছিল ঐতিহাসিক বস্তুবাদী ও সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি প্রাচীন ভারতকে অন্ধভাবে মহিমান্বিত করেননি, আবার তাকে সম্পূর্ণ অস্বীকারও করেননি। তাঁর পদ্ধতি ছিল অনেক বেশি কঠিন, প্রাচীন ভারতীয় সমাজকে তার নিজস্ব ঐতিহাসিক বাস্তবতার মধ্যে দাঁড় করিয়ে দেখা। সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামো, উৎপাদন ব্যবস্থা, সম্পদের সম্পর্ক এবং ক্ষমতার বিন্যাস কীভাবে মানুষের ধর্ম, সংস্কৃতি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে প্রভাবিত করে, সেই প্রশ্ন তাঁর গবেষণার কেন্দ্রে ছিল। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Indian Theogony এই পদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। বৈদিক দেবদেবীর চরিত্র ও গুরুত্বের পরিবর্তনকে তিনি কোনো অলৌকিক, স্থির সত্য হিসেবে দেখেননি। বরং মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনের পরিবর্তনের সঙ্গে ধর্মীয় কল্পনার পরিবর্তনের সম্পর্ক খুঁজেছেন। একইভাবে ‘বেদের যুগে ক্ষুধা ও খাদ্য’-এর মতো গবেষণায় তিনি প্রাচীন সমাজকে তার সবচেয়ে মৌলিক বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনতে চেয়েছেন, মানুষ কীভাবে বাঁচত, কী খেত, কীভাবে সম্পদ উৎপাদিত ও বণ্টিত হত। দেবতা ও ধর্মের ইতিহাসের পাশাপাশি তিনি দেখতে চেয়েছেন মানুষের পেটের ইতিহাসও।
মার্ক্সবাদী ও নাস্তিক হিসেবে তাঁর গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্তগুলি স্বাভাবিকভাবেই তৎকালীন রক্ষণশীল ও সনাতনপন্থী মহলের একাংশের তীব্র বিরোধিতা ও বিদ্রুপের মুখে পড়েছিল। কিন্তু প্রতিকূলতা তাঁকে পিছিয়ে দেয়নি, বরং প্রাচীন ভারতকে অলৌকিকতার আবরণ সরিয়ে সত্য ও ইতিহাসের আলোয় দেখার তাঁর জেদ আরও দৃঢ় হয়েছিল। তাঁর শাণিত কলমে একের পর এক প্রকাশিত হতে থাকে মূল্যবান গবেষণাগ্রন্থ ও প্রবন্ধ। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ‘বেদের যুগে ক্ষুধা ও খাদ্য’ (১৯৯৮), ‘বেদে সংশয় ও নাস্তিক্য’ (২০০০), এবং ইংরেজিতে প্রকাশিত ‘Women and Society in Ancient India’ (১৯৯৪) ও ‘Fatalism in Ancient India’ (১৯৯৫)। এই রচনাগুলিতে তিনি শুধু প্রাচীন ভারতীয় সমাজের ধর্মীয় বিশ্বাসকে বিশ্লেষণ করেননি, সেই বিশ্বাসের ভিতরে থাকা সংশয়, যুক্তি, সামাজিক বাস্তবতা এবং মানুষের জীবনসংগ্রামের দিকগুলিকেও সামনে এনেছিলেন।
সুকুমারী ভট্টাচার্যের গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল নারী। ‘প্রাচীন ভারতে নারী ও সমাজ’-এর মতো কাজের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন, ভারতীয় সমাজে নারীর অবস্থান কোনো চিরস্থায়ী বা অপরিবর্তনীয় বিষয় নয়। সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের সঙ্গে নারীর অধিকার, স্বাধীনতা এবং সামাজিক অবস্থানও বদলেছে। নারীর ওপর আরোপিত বিধিনিষেধকে তিনি শুধুমাত্র ধর্মীয় বিশ্বাসের ফল হিসেবে দেখেননি, বরং সম্পত্তি, পরিবার, উত্তরাধিকার, শ্রম এবং ক্ষমতার সম্পর্কের সঙ্গে তার যোগসূত্র অনুসন্ধান করেছেন। কে সম্পত্তির অধিকারী, কে উত্তরাধিকারী, কে শ্রম দেয়, কে সিদ্ধান্ত নেয়, কার শরীর ও জীবনের ওপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়, এই প্রশ্নগুলিকে প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য ও শাস্ত্রের ভিতর থেকেই অনুসন্ধান করেছিলেন তিনি। ফলে তাঁর নারীবিষয়ক গবেষণা একই সঙ্গে নারী ইতিহাস এবং ক্ষমতার ইতিহাস হয়ে উঠেছিল।
তবে সুকুমারী ভট্টাচার্যের সবচেয়ে জীবন্ত উত্তরাধিকার সম্ভবত তাঁর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি এমন একটি শিক্ষাদর্শ গড়ে তুলেছিলেন যেখানে শিক্ষক ও ছাত্রের সম্পর্ক ছিল একমুখী কর্তৃত্বের নয়, বরং বৌদ্ধিক সংলাপের। তাঁর ছাত্রছাত্রীদের কাছে তিনি ছিলেন একই সঙ্গে কঠোর যুক্তিবাদী শিক্ষক এবং স্নেহশীল অভিভাবক। ক্লাসরুমের বাইরে করিডোরে, আলোচনার টেবিলে কিংবা তাঁর বাড়িতে ছাত্রদের সঙ্গে তাঁর আলোচনা চলত। তাঁর প্রভাবিত ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ছিলেন প্রখ্যাত লেখিকা ও শিক্ষাবিদ নবনীতা দেবসেন, যিনি পরবর্তীতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে দীর্ঘকাল অধ্যাপনা করেন। ছিলেন প্রাবন্ধিক ও পুরাণ গবেষক নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী, যিনি তাঁর তত্ত্বাবধানে কৃষ্ণ-সংক্রান্ত নাটক নিয়ে গবেষণা করে ডক্টরেট অর্জন করেন। ছিলেন অধ্যাপক নন্দিতা বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি ১৯৮৭ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ছিলেন।
সংস্কৃত বিভাগের শিক্ষক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে পরবর্তীতে দায়িত্ব পালন করা বিজয়া গোস্বামী তার লেখায় বলেছেন "ছাত্রাবস্থা থেকে দেখেছি, সাধারণত যেভাবে পড়ানো হয়, মানেটা বুঝিয়ে, প্রশ্ন আলোচনা করে, সুকুমারীদি সে ভাবে পড়াতেন না। বরং ছাত্রছাত্রীদের চিন্তার উপাদান জোগাতেন, স্বাধীনভাবে ভাবতে উৎসাহ দিতেন। এটা সারাজীবনই তিনি করে গেছেন। তিনি অবসর গ্রহণের পরে আরও বেশি যেন ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন, সভা-সমিতি, লেখালিখি নিয়ে। আমাকে প্রায়ই বলতেন, “কুসংস্কার ও মিথ্যার একটা প্রবল প্রচার চলেছে! তোমরা তার বিরুদ্ধে লড়ে যাও! তোমাদের হাতে সবচেয়ে বড়ো অস্ত্র হল, তোমাদের জ্ঞান! তোমরা তো প্রাচীন গ্রন্থ পড়েছ, সেখানে কী আছে তাও জানো। সেটাই হাতিয়ার করে যুদ্ধ চালিয়ে যাও!”
এই স্মৃতিই হয়তো সবচেয়ে ভালোভাবে বুঝিয়ে দেয়, তাঁর কাছে শিক্ষা কেবল তথ্য অর্জন নয়, সমাজের অন্ধকারের বিরুদ্ধে যুক্তি ও জ্ঞানকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার ক্ষমতা অর্জন।
সুকুমারী ভট্টাচার্যের বামপন্থী ও মানবতাবাদী চিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তত্ত্ব ও বাস্তব জীবনের সম্পর্ক। তাঁর কাছে গবেষণা কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার বা গবেষণাপত্রের বিষয় ছিল না। জ্ঞান যদি সমাজের বাস্তব সমস্যাকে স্পর্শ না করে, তবে সেই জ্ঞানের সামাজিক মূল্য কতটা, সেই প্রশ্ন তাঁর চিন্তায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ১৯৮২ সালে ‘সচেতন’ নামে একটি অলাভজনক সামাজিক সংগঠন গড়ে তোলার সঙ্গে তিনি যুক্ত হন, যার লক্ষ্য ছিল নিপীড়িত ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাঁদের সামাজিক ও আইনি সহায়তা দেওয়া। যে মানুষ প্রাচীন শাস্ত্রে নারীর অবস্থান নিয়ে গবেষণা করেছিলেন, তিনিই সমকালীন সমাজের নিপীড়িত নারীর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। ইতিহাসের গবেষণা এবং বর্তমান সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা তাঁর কাছে বিচ্ছিন্ন দুটি বিষয় ছিল না। তাঁর ছাত্ররা তাঁর মধ্যে তত্ত্ব ও সামাজিক প্রয়োগের, Theory এবং Praxis-এর, এই বিরল মেলবন্ধনই দেখেছিলেন।
সুকুমারী ভট্টাচার্যের রাজনৈতিক অবস্থানও তাঁর বৌদ্ধিক অবস্থানের মতোই স্পষ্ট ছিল। আজীবন বামপন্থী রাজনীতি ও প্রগতিশীল চিন্তার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থেকেও তিনি কোনো রাজনৈতিক আনুগত্যকে নিজের বিবেকের ঊর্ধ্বে স্থান দেননি। ২০০৯ সালের নন্দীগ্রামের ঘটনায় তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের ভূমিকার বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদী অবস্থান নিয়েছিলেন। এই অবস্থানের পর তাঁর সঙ্গে পার্টির সম্পর্কেরও ছেদ ঘটে। একজন আজীবন বামপন্থী মানুষের পক্ষেও নিজের রাজনৈতিক পরিসরের সমালোচনা করার যে নৈতিক স্বাধীনতা প্রয়োজন, সুকুমারী ভট্টাচার্যের জীবনের এই অধ্যায়টি তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। (এই পর্ব নিয়ে আমরা পরে বিস্তারিত আলোচনা করব।)
সুকুমারী ভট্টাচার্যকে তাই কোনো দলীয় স্লোগানের মধ্যে আটকে দেখার প্রয়োজন নেই। তাঁর রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক অবস্থান ছিল স্পষ্ট। তিনি প্রগতিশীল, বামপন্থী এবং বস্তুবাদী চিন্তার দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল, নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসকে তিনি গবেষণার বিকল্প বানাননি। বরং প্রাচীন ভারতীয় সমাজকে যুক্তি, পাঠ, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং সামাজিক বাস্তবতার সাহায্যে বোঝার চেষ্টা করেছেন। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, ঐতিহ্যকে ভালোবাসার অর্থ তার প্রতিটি বক্তব্যকে সত্য বলে মেনে নেওয়া নয়। নিজের অতীতকে সম্মান করার অর্থ তার অন্ধ পূজাও নয়। বরং নিজের ইতিহাসকে সত্যিই জানতে হলে তার গৌরবের পাশাপাশি তার বৈষম্য, ক্ষমতার সম্পর্ক, শ্রেণি বিভাজন এবং লিঙ্গ বৈষম্যের ইতিহাসও জানতে হয়।
২০১৪ সালের ২৪ মে, ৯২ বছর বয়সে সুকুমারী ভট্টাচার্য প্রয়াত হন। কিন্তু একজন শিক্ষকের মৃত্যু তাঁর উত্তরাধিকারের মৃত্যু নয়। আজ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের দিকে তাকালে তার ছাত্র আন্দোলন, রাজনৈতিক সংগ্রাম, সাংস্কৃতিক পরিসর এবং মুক্তচিন্তার দীর্ঘ ঐতিহ্যের পাশাপাশি এমন মানুষদেরও মনে রাখতে হয়, যাঁরা এই পরিবেশকে বৌদ্ধিক ভিত্তি দিয়েছিলেন। সুকুমারী ভট্টাচার্য তাঁদের অন্যতম। তিনি সংস্কৃতকে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে এসেছিলেন, এমন নয়, সংস্কৃত তার বহু আগেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল। তাঁর বিশেষ কৃতিত্ব ছিল সংস্কৃতচর্চাকে অন্ধ আনুগত্যের জায়গা থেকে প্রশ্ন, অনুসন্ধান ও সমাজ বিশ্লেষণের দিকে নিয়ে যাওয়া। তাঁর কাছে শাস্ত্র ছিল প্রশ্নের ঊর্ধ্বে কোনো পবিত্র বস্তু নয়, বরং ইতিহাসের দলিল। আর ছাত্র ছিল মুখস্থ করার পাত্র নয়, স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শেখা একজন মানুষ।
সুকুমারী ভট্টাচার্য আমাদের শিখিয়েছেন, নিজের ঐতিহ্যকে ভালোবাসার অর্থ তার প্রতিটি বক্তব্যকে সত্য বলে মেনে নেওয়া নয়। নিজের অতীতকে সম্মান করার অর্থ তার অন্ধ পূজাও নয়। বরং নিজের ইতিহাসকে সত্যিই জানতে হলে তার গৌরবের পাশাপাশি তার বৈষম্য, ক্ষমতার সম্পর্ক, শ্রেণি বিভাজন এবং লিঙ্গ বৈষম্যের ইতিহাসও জানতে হয়। এই কারণেই তাঁর উত্তরাধিকার শুধু তাঁর বইয়ে নেই। তা আছে তাঁর ছাত্রদের চিন্তায়, যাদবপুরের সংস্কৃতচর্চার স্বতন্ত্র ধারায় এবং সেই বৃহত্তর মুক্তবুদ্ধির ঐতিহ্যে, যেখানে কোনো গ্রন্থ, কোনো প্রতিষ্ঠান, এমনকি কোনো শিক্ষকও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নন। শাস্ত্রকে প্রশ্ন করার সেই সাহসটাই ছিল তাঁর শিক্ষা, আর সেই শিক্ষাই আজও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বৌদ্ধিক উত্তরাধিকারের অন্যতম মূল্যবান অংশ।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

No comments:
Post a Comment